প্রাচীন হরিকেল রাজ্য ও মধ্য চট্টগ্রামের ইতিবৃত্ত




হরিকেল রাজ্য:
মধ্য চট্টগ্রামের একটি বিশেষত্ব হলো এখানেই প্রাচীন যুগে হরিকেল নামে একটি স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল। কালক্রমে পুরো চট্টগ্রামে এই রাজ্যের প্রসার ঘটেছিল।

মধ্য চট্টগ্রাম:
অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলা প্রায় ১৬৬ মাইল দীর্ঘ। চট্টগ্রামের মূল ভূখণ্ড হিশেবে মধ্য চট্টগ্রামও এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মধ্য চট্টগ্রাম বলতে কর্ণফুলী নদী ও শংখ নদের মধ্যবর্তী ভূভাগ।

প্রাচীন বাংলার এই বিস্তৃত ও সমৃদ্ধিশালী রাজ্য সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান খুব সীমিত ছিল এই বই প্রকাশের আগেও। কারণ, বহুদিন পর্যন্ত রাজ্যটির অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে পারেনি গবেষকরা। এই বইটি পড়ার মাধ্যমে পাঠক, হরিকেল রাজ্যের ইতিহাসের বেশ কিছু নূতন তথ্যসহ এই রাজ্যের অবস্থান এবং প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত ধারনা পাবে।

প্রাচীন হরিকেল রাজ্যের তিনটি স্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনটি স্থান হলো: রাজধানী বর্দ্ধমানপুর, প্রধান বন্দর দেবগ্রাম এবং প্রধান বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র পণ্ডিত বিহার। এই গ্রন্থে এই তিনটি স্থান সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

হরিকেল রাজ্য শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য ও জ্ঞানচর্চা সর্বক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিল। পাঠক বইটি পাঠ করার মাধ্যমে এই বিষয়গুলোও জানতে পারবে।

প্রাচীন হরিকেল রাজ্য প্রায় পাঁচশ স্থায়ী হয়েছিল। এরপর ইতিহাসের নিয়মে পতন ঘটে। হরিকেল রাজ্য পতন ঘটার প্রধান কারণ ছিল, বহিঃশত্রুর আক্রমণের ফলে।

পরবর্তীতে হরিকেল রাজ্যের বিলুপ্তি স্থানে চক্রশালা ও দেবগ্রাম নামে দুটি রাজ্যের স্থাপিত হয়।

চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম মুসলিম শাসকের দ্বারা বিজিত হলেও মধ্য চট্টগ্রামে ষোড়শ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত মুসলিম অধিকার বিস্তৃত হয়নি। ষোড়শ শতাব্দীতে মধ্য চট্টগ্রাম গৌড় সুলতান, ত্রিপুরা রাজ এবং আরাকানি রাজার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে ও সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আরাকানি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু চট্টগ্রামে আনাকানি আধিপত্য কোনরূপ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। উত্তর চট্টগ্রামকে জনশূন্য করা হয় এবং মধ্য চট্টগ্রামকে পোর্তুগীজ জলদসু্দের দিয়ে দেওয়া হয়। কেবলমাত্র দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল।

১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম মোগলদের দ্বারা বিজিত হয়। মোগল বিজয়ের ফলে উত্তর চট্টগ্রামে পুনরায় জনবসতি শুরু হয়। আর মধ্য চট্টগ্রামে পোর্তুগীজদের কার্যকলাপ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৭৬০ সালে চট্টগ্রামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনভুক্ত হয়। ১৮৬১ সাল পর্যন্ত কোম্পানির শাসন বলবৎ ছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার স্বহস্তে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে। বিদ্রোহ যাতে পুনরায় না ঘটতে পারে ইংরেজ সরকার একের পর এক কঠোর আইন প্রণয়ন করতে থাকে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে আমাদের মননশীলতার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনকে বলা হয় রেনেসাঁস আন্দোলন। শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা, সমাস সংস্কার, সমাজ উন্নয়ণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে রেনেসাঁস আন্দোলেনর প্রভাব সুষ্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়।

সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা ক্রমশ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে জন্মলাভ করে স্বাধীনতা সংগ্রাম। রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্বাধীনতা সংগ্রাম উভয় ক্ষেত্রে মধ্য চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গ্রন্থটি মূলত চট্টগ্রামের মধ্যাঞ্চল নিয়ে লিখা হলেও পাঠক বৃহত্তর চট্টগ্রামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে আরও ভালোভাবে জানতে পারবে।

প্রকাশক: নন্দন বইঘর
লেখক: সূনীতি ভূষণ কানুনগো
মূল্য: ২০০ টাকা।

No comments

Theme images by enot-poloskun. Powered by Blogger.