বঙ্গবন্ধুকে হেয় প্রতিপন্ন করলেন নির্মলেন্দু গুণ ও আনিসুল হক
এ বি এম ফয়েজ উল্যাহ::
পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর জন্মভূমি নেত্রকোনায় গড়ে তুলেছেন ‘কবিতাকুঞ্জ’[ নামে কাব্য-গবেষণার একটি প্রতিষ্ঠান। ঐ গবেষণা কেন্দ্রে দেশি-বিদেশি কাব্য গ্রন্থ নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ রয়েছে। এই মহৎ কাজের জন্য আমরা কবি নির্মলেন্দু গুণকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।
তারই প্রেক্ষিতে আমাদের আজকের গবেষণার বিষয় নির্মলেন্দু গুণেরই কবিতা, “স্বাধীনতা এই শব্দটি আমাদের কি করে হলো”। সাথে সাহিত্যিক, সাংবাদিক আনিসুল হকের কথাও থাকবে।
নির্মলেন্দু গুণ এই কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে ‘বিপ্লবী কবি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আর শ্রোতাদের ‘লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা’।
তিনি লিখেছেন-
‘কখন আসবে কবি? কখন আসবে কবি?
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মত দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।’
এটি নির্মলেন্দু গুণের বিখ্যাত কবিতা।
জাতিরজনক, বঙ্গশার্দুল, বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, ভারত- উপমহাদেশে শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য দৃপ্ত পায়ে মঞ্চে আগমনকে ‘রবীন্দ্রনাথের মত’ বলা হলো কেন?
রবীন্দ্রনাথ কোন বিপ্লবী কবি? কোন স্বাধীনতা সংগ্রামী? রাষ্ট্রনায়ক? তিনি তাঁর জীবনে কোন মঞ্চে, কখনও ভারতের তথা নিজদেশের স্বাধীকার, স্বাধীনতার কথা বলার জন্য, জনতাকে উদ্বীপ্ত করা ভাষণ দেয়ার জন্য ‘দীপ্ত পায়ে’ উঠেছিলেন? - উঠেননি। তিনি কখনো কোন সংস্থা, দেশ-জাতি দ্ধারা বিশ্বকবির খেতাব পেয়েছিলেন? পাননি।
জাতিরজনকে লাখ লাখ জনতার উপস্থিতিতে জনসভা থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেলায় তার কিছুই ঘটেনি। কোন সংগঠন, দেশ, জাতির কাছ থেকে তিনি ‘বিশ্বকবি’ উপাধি লাভ করেন নি।
শান্তিনিকেতনের ব্রম্মাচর্য আশ্রমের শিক্ষক ব্রম্মবান্ধব উপাধ্যায় ছাত্র শিক্ষকদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে ‘বিশ্বকবি’ ও ‘গুরুদেব’ সম্বোধন করতে।
এই যা!
সুতরাং অসম দুইজনের মধ্যে তুলনা করা কেন?
প্রারম্ভে জানিয়ে রাখি, যার সাথে উপমা দেয়া হয়, ‘তা প্রধান’/ ‘মুখ্য’। যাকে তুলনা করা হয়, তা ‘অপ্রধান’/ ‘গৌণ’। যেমন:- চাঁদের মত মুখ। এখানে মুখ্য বা প্রধান হচ্ছে ‘চাঁদ’। মুখটা গোণ। বা ‘রবীন্দ্রনাথের মত নির্মলেন্দু গুণ’। পাকা দাঁড়ি, মোছে তাঁকে সত্যিই রবীন্দ্রনাথের মতই দেখায়। এখানে প্রধান বা মুখ্য রবীন্দ্রনাথ। নির্মলেন্দু গুণ অপ্রধান/ গৌণ।
কবি নির্মলেন্দু গুণ এই কবিতায় হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুকে কবি ‘রবীন্দ্রনাথে’র সাথে তুলনা করে রবীন্দ্রনাথকে প্রধান ব্যক্তিত্ব এবং জাতিরজনককে গৌণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ নির্মলেন্দু গুণ বঙ্গবন্ধুকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ স্বীকার করেন না।
সাহিত্যিক আনিসুল হকও জাতিরজনকে ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ স্বীকার করেন না। তিনি যুগ্ম-শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব হাজির করে প্রথম আলোয় লেখেন,
“বিবিসি’র জরিপের মাধ্যমে আমরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ দুই বাঙালিকে নির্বাচিত করেছি”।
কি ধৃষ্টতাপূর্ণ মিথ্যা কথন! বিশ্ব জানে, সেদিন ভারত, বাংলাদেশের তথা বাংলা ভাষাভাষিদের যে সংখ্যক ভোট পেয়ে বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম বাঙালি নির্বাচিত হয়েছিলেন, তার ধারেকাছেও ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বঙ্গবন্ধুর প্রাপ্ত ভোটের অর্ধেকেরও বহু কম ভোট পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁকে বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ করে দেয়ার কি হটকারি প্রচেষ্টা!
রবীন্দ্রনাথ নোবেলজয়ী একজন কবি। তাঁর সাথে নোবেলজয়ী আঁদ্রেজিদ, বরিস পাস্তারনাক, তলস্তয়, কিপলিং, ইভান বুনিন গংদের সাথে তুলনা হতে পারে। কবির সাথে কবির।
বাংলাদেশের স্থপতি, রাষ্ট্রনেতা, সংগ্রামী, বিপ্লবী মহান নেতা শেখ মুজিবের ‘দৃপ্ত পায়ে’ মঞ্চে উঠাকে তুলনা করা যেতে পারে চীনের মাও সে তুঙ, রাশিয়ার লেলিন, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, দক্ষিণ আমেরিকার নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। তাহলে কেন এই হটকারি উপমা!
তবে রবীন্দ্রনাথের সাথে এই উপমা কি তাঁর নোবেল জয়ের জন্য? বঙ্গবন্ধুও শান্তিতে ‘জুলিও কুরি’ পুরস্কার লাভ করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন সহ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনেতাদের সাথে স্বাধীনতার অন্যতম মহান দলিল হিসেবে ইউনেস্কোতে স্থান লাভ করেছে।
রবীন্দ্রনাথের কোন সাহিত্যিক ভাষণও তো কোন আন্তর্জাতিক তথা বিশ্বসংস্থায় স্থান লাভ করেনি। তো কি নিয়ে তুলনা?
বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাভাষা’ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা শুধু নন, তিনিই ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলাভাষাকে বিশ্বদরবারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের পর পর ‘পিকিং আন্তর্জাতিক যুবসম্মেলনে’ও তিনি বাংলায় ভাষণ দেন।
জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু 'বাংলা'কে স্বাধীন বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রভাষা’র মর্যাদা দিয়েছেন।
অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষার সাথে বেঈমানি করেছেন। ১৯১৮ খ্রীষ্টাব্দে গোটা ভারতের জনসংখ্যা যখন ত্রিশকোটি, তখন বাংলাভাষাভাষি মানুষের সংখ্যা ছিল সাড়ে সাতকোটি। ভারত স্বাধীনতা পেলে তার ‘রাষ্ট্র ভাষা’ কি হবে? জানতে চেয়ে রবীন্দ্রনাথকে লেখা গান্ধিজীর এক পত্রের জবাবে বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর মাতৃভাষা ‘বাংলা’কে বাদ দিয়ে ‘হিন্দি’ কে ভারতের ‘জাতীয়ভাষা’ করার পক্ষে রায় দিয়ে উত্তর পাঠান।
তিনি শান্তিনিকেতনে সর্বভারতীয় পন্ডিতদের সন্মেলন ডেকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত সভায়, যাতে সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, বাংলাকে বাদ দিয়ে ‘হিন্দিকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ করার পক্ষে রায় প্রকাশ করে গান্ধিজীকে পত্র লিখে জানান, The only possible national language for inter provincial intercourse is Hindi in India ( রবীন্দ্র জীবনী -৪র্থ খন্ড) অথচ ‘হিন্দি’ ভারতের কোন প্রদেশের লোকের মাতৃভাষা ছিল না।
প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, সাহিত্যিক জনাব আনিসুল হক প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয় “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” তে লেখেন,“বাঙালি যে একটা গৌরবদীপ্ত জাতি, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি যে অত্যন্ত ঋদ্ধ, এই গৌরবের জন্য আমরা রবীন্দ্রনাথের কাছে ঋণী। সেই গৌরববোধ থেকে ভাষা আন্দোলন ঃ ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’ শ্লোগান ।
এতোবড় মিথ্যাচার একজন বুদ্ধীজীবী আনিসুল হক কেমন করে করেন!
অথচ ইতিহাস সাক্ষী, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিলে ১৯৬৯ সনে যেসব বিপ্লবী-শ্লোগান আকাশ বাতাশ কাঁপিয়ে ছিল, তারমধ্যে ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ছিল প্রধান।
১৯৬৯ সালে উদ্ভাবিত, ছাত্র-জনতার কণ্ঠে উচ্চারিত এই বিপ্লবী শ্লোগান রবীন্দ্রনাথের কোন লেখায় পেলেন, তার উল্লেখ না করেই এতবড় মিথ্যাচার করে গেলেন আনিসুল হক!
সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী সবার জানা, রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতীয়তাবাদী কবি নন। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের তীব্র বিরোধীতা করতেন। রবীন্দ্রনাথ বাঙালি নামের কোন জাতিসত্তাকে স্বীকার করেন নি। -অধ্যাপক আবদুল আউয়াল।
তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। অপর পক্ষে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠতম প্রবক্তা। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই তিনি বাঙালি জাতির মুক্তিসনদ ৬দফা উত্থাপন করেছিলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ তাঁর হাতেই লালিত পালিত, পরিপুষ্টতা, পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির মাতৃভূমি ‘জাতি-রাষ্ট্র’ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বাধীনতা লাভের পরপরই ১৯৭২-এ তিনি সংবিধানে বাংলাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা করেছেন।
সুতরাং একজন বাংলাভাষা বিরোধী রবীন্দ্রনাথের সাথে বাংলাভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী পূর্ব বাংলার সাহসী জাতিকে তাঁর অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন হাস্যকর, তেমনি বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের জঙ্গি শ্লোগানসমুহকে রবীন্দ্রনাথের প্রদত্ত বলাও মুক্তিযুদ্ধের খেলাফ ও মিথ্যাচার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন। তিনি ব্রিটিশদের স্বার্থ রক্ষায় এতো অন্ধ ছিলেন যে, তাদের অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, অপশাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরেননি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
‘পড়ে পাওয়া, কেড়ে নেওয়া স্বাধীনতায় আমি বিশ্বাস করি না। মনের স্বাধীনতাই আসল’।
পরাধীন এবং কোটি কোটি নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদ, চোখের জল আর রক্তের মাঝে থেকে তিনি কিভাবে মনে স্বাধীনতা পেতেন, তা তিনি ছাড়া ভগবানও জানতেন না।
অথচ পরাশক্তি পাকিস্তানীদের নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন, লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ করে বঙ্গাবন্ধু বাঙালির মাতৃভূমি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাইতো বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্থপতি। জাতিরজনক। বিশ্বের অন্যতম মহানায়ক। আর তাঁকেই বানানো হয়েছে রবীন্দ্রনাথের অনুকরণকারি। কি ঘৃণ্য প্রচেষ্টা!
যুগশ্রষ্টা মহানায়কদের সম্পর্কে দার্শনিক ‘হেগেল’ বলেন, The great man of the age is one who can put into words of the will of his age,What its will is, and accomolish it.What he does is the heart and essence of the age,he actualizes his age. (Philosophy if Right) -এর ভিত্তিতে নিঃসন্দেহে বলা যায়, শেখ মুজিব তাঁর যুগের ইচ্ছা ও গবেষণাকে (Will of the age) বাস্তবে রূপ দিয়েছেন (Actualize his age)।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিয় কুরি’ শান্তিপদক প্রদান করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় কৃতিত্ব এখানে যে, তিনি বাংলাদেশের চারটি ধর্মে বিভক্ত অসম ও অসমন্বিত উপাদানে গঠিত বাঙালি জাতির এবং প্রায় ঊনপঞ্চাশটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে একই জাতীয়তাবাদী (বাঙালি) আন্দোলনে অটুট ঐক্যে গ্রথিত করে একটি ‘জাতি-রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন। এরকম সাফল্য নজিরবিহীন (শেখ মুজিব কেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠা এবং জাতির পিতা- শামসুজ্হামান খান)।
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য Lord Fenner Brock বলেন, In sense, Sheikh Mujib is a great leader than George Washington, Mahatma Gandhi and De Valera|
জবাব এদেরকেই দিতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশের জনতার আদালতে। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা কবি কাজী নজরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর আগমনের আভাস “আমি সৈনিক” প্রবন্ধে এইভাবে দিয়েছেন, “রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দ, প্রফুল্ল বাংলার দেবতা। কিন্তু সেনাপতি কই? আমরা যে আশাকরে আছি, কখন সে মহা-সেনাপতি আসবে?” সে মহা সেনাপতিই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমাম।
রবীন্দ্রনাথের বাণী ছিল, “মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ”। এটি ছিলো ইংরেজ তোষণের পক্ষে, বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতবাসির স্বাধীকার, স্বাধীনতা সংগ্রাম দমনের জন্য একটি চক্রান্ত মাত্র। তা নাহলে তিনি কি ১৭৫৭ এর পলাশী, ১৮৫৭ এর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ১৯১৯ শের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড, ভারতের স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের ফাঁশিসহ নীলচাষীদের উপর অত্যাচার, নিত্য খুন খারাবীর খবর জানতেন না? - জানতেন। তা সত্তেও তাদের উপর বিশ্বাস রাখতে আবেদন কেন? কারণ, তিনি ভারতের স্বাধীনতা চাননি।
আমরা বাঙালিরা এবং বাঙালিদের অবিংসাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নির্যাতক, শোষক পশ্চিমা শাসকদের উপর বিশ্বাস রাখেননি। তাই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন জুলুম, নির্যাতন, অর্থনৈতিক শোষণ, লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ, আন্দোলন ও স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন তিনি। বিপ্লবী মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকন্ঠে লক্ষ লক্ষ জনতার সভায় ঘোষণা করেছেন,
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম....
রক্ত যখন দিয়েছি, আরো দিবো,
এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ”।
তো এই মহানায়ক, স্বাধীনতার ঘোষকের দৃপ্ত পায়ে হেটে মঞ্চে উঠাকে একজন শান্তিকামী, স্বাধীনতা বিরোধী, নিরীহ কবির পদচলার সাথে তুলনা করা হলো কেন? কেন জাতিরজনকের প্রতি এই অবজ্ঞা? এই পরিহাস? কেন এই হটকারিতা?
আর একটি জলন্ত মিথ্যা হরহামেশা শুনা যায়, “রবীন্দ্রনাথই বাঙালি আর বাংলাভাষাকে বিশ্বদরবারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।”
স্মরণ রাখা দরকার, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের যেসব দেশে বক্তৃতা করেছেন তাতে ভুলেও তাঁর কণ্ঠে বাংলা আর বাঙালি শব্দ দুটি একবারও উচ্চারিত হয়নি। তিনি যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাও বাংলা কোন বইয়ের জন্য নয়। পেয়েছেন ইংরেজি কাব্য Song offerings এর জন্য। যে কাব্যগ্রন্থে তৎকালিন ভারতের স্বাধীকার, স্বাধীনতা আন্দোলন, বৃটিশের নির্যাতন, শোষণ তথা সমাজ-সংস্কারর ও অর্থনীতি সম্বন্ধে একটি বাক্যও লেখা নেই। উপরন্তু এ’মিথ্যেকথা বলে জাতিরজনক শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকেই অস্বীকার করা হচ্ছে।
কারণ, জাতিরজনকই সর্বপ্রথম জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ প্রদান করে বাংলাভাষাকে বিশ্বে পরিচয় করে দিয়েছেন। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের মাধ্যমে একুশে ফেব্রুআরি ভাষাদিবসকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” ঘোষণা করায়ে বাংলাভাষাকে বিশ্বে মর্যাদার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করায়েছেন।
রবীন্দ্রনাথ বাঙালির জাতীয়সাহিত্যেরও রচয়িতা নন। কারণ, যে সাহিত্য ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত, সম্প্রদায়ের উর্ধে থেকে সকলের কথা, সুখ, দুখ, আনন্দ, বিরহ, সমাজ সংস্কৃতি, স্বাধীকার, স্বাধীনতার কথা বলে, সেটিই সে জাতির জাতীয় সাহিত্য। এর রচয়িতা মানবতার কবি, অসাম্প্রদায়িকতার কবি, বাঙালি জাতীয়তাবাদের কবি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
অথচ রবীন্দ্রনাথ কোনদিনই জাত পাত ধর্ম বর্ণ তথা সাম্প্রতিকতার উর্ধ্বে উঠতে পারেন নি। তাঁর কবিতায় প্রবন্ধে মুসলিম বিদ্বেষ, পৌত্তলিক হিন্দু বিদ্বেষ, বর্ণভেদ প্রকটভাবে পরিলক্ষিত। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘নৈবদ্য’, শিবাজি উৎসব কবিতা সহ বহু ছোটগল্প, প্রবন্ধে, কবিতায় মুসলমানদের প্রতি চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। তিনি মুসলমানদেরকে শুধু ‘hebÕ’ বলেই ক্ষান্ত হননি, তাঁর ‘সমস্যা পূরণ’ প্রবন্ধে মুসলমানদের চরম অপদস্থ করে এ'ভাবে লিখেছেন, “অছিমদ্দীন তোমার ভাই হয়, আমার পুত্র। বিপিন চমকিয়া উঠিয়া কহিলেন, ‘যবনীর গর্ভে?’ কৃষ্ণগোপাল কহিলেন, ‘হ্যা, বাপু’। অন্যদিকে জাতিরজনক শেখ মুজিবুর রহমান আমৃত্যু অসাম্প্রদায়ীক ছিলেন।
তো এই অসাম্প্রদায়িক মহান রাষ্ট্রনায়ক, মহাপুরুষের সাথে সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথের তুলনা করে কবি নির্মলেন্দু গুন, জাতিরজনকের প্রতি এমন অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা প্রদর্শন করলেন কেন? এর ব্যাখ্যা কি?
আমরা দাবি করবো, স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে কবি (বঙ্গবন্ধু) ‘দৃপ্ত পায়ে মঞ্চে উঠলেন, না বলে নির্মলেন্দু গুন’ রবীন্দ্রনাথের মত ‘দৃপ্ত পায়ে’ মঞ্চে উঠলেন, কেন কিসের ভিত্তিতে লিখলেন,তার ব্যাখ্যা দিবেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘ভাইয়েরা আমার’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। তাতেও তিনি লিখেছেন বঙ্গবন্ধু, ‘দৃপ্ত পায়ে’ মঞ্চে উঠলেন। সুতরাং নির্মলেন্দু গুণের অকারণের উপমা ‘রবীন্দ্রনাথের মত’, একজন কবিকে জাতিরজনকের থেকে উর্ধে তোলার এই মানসিকতা এককথায় দৃষ্টতাপূর্ণ।
জাতিরজনকের শাহাদাত দিবস উপলক্ষে একজন বামপন্থী মন্ত্রী ‘প্রথম আলো’য় যে কলাম লিখেছেন, সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে লিখেছেন,
“বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন। বঙ্গবন্ধু একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, একটি দেশ, বাঙালি জাতীয়তার একটি মহাকাব্য, একটি আন্দোলন, জাতি নির্মাণের কারিগর, ঠিকানা প্রদানের সংগ্রাম, একটি বিপ্লব, একটি অভ্যুত্থান, একটি ইতিহাস, বাঙালি জাতির ধ্রুবতারা: জাতির উত্থান-রাজনীতির কবি, জনগণের বন্ধু, রাষ্ট্রের স্থপতি, স্বাধীনতার প্রতীক, ইতিহাসের মহানায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি”।
এর আলোকে রবীন্দ্রনাথ কি? তিনি মহান কবি। আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির প্রাজ্ঞতম পুরুষ। তাই বলে কি জাতিরজনকের সাথে তুলনীয়! অবশ্যই নয়।
নির্মলেন্দু গুণ বড় কবি। তিনি নিজেকে আওয়ামীলীগের কবি দাবি করেন। তাঁর ‘স্বাধীনতা’ কবিতা অবশ্যই একমন খাঁটি দুধের মত দামী। কিন্তু তিনি তাতে ‘রবীন্দ্রনাথের মত’ শব্দের ইচ্ছাকৃত গো-চনা ঢেলে পুরো দুধের (কবিতার) সর্বনাশ করছেন। জাতিরজনককে রবীন্দ্রনাথ থেকে ছোট দেখানোর জন্য এটি ছিল গুণের সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র। আর জনাব আনিসুল হকের ষড়যন্ত্রও উদ্যেশ্যমূলক। আমরা চাইবো, নির্মলেন্দু গুণ এবং আনিসুল হক তাঁদের এইসব অপকর্মের জন্য লজ্জিত হবেন। নির্মলেন্দু গুণ তাঁর কবিতা থেকে ‘রবীন্দ্রনাথের মত’ অংশটি বাদ দিবেন।
জনাব আনিসুল হক তাঁর লেখা কলাম ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ থেকে বিভ্রান্তিমূলক কথাগুলি ঘোষণা দিয়ে সরিয়ে ফেলবেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি আমাদের অপরিসীম শ্রদ্ধা। তবে তা কিছুতেই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি পুরুষ, জাতিরজনকের উর্ধে নয়। বাঙালি আজ নিজস্ব মাতৃভূমি, নিজস্ব মাতৃভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির মালিক হয়েছে যাঁর সংগ্রাম, ত্যাগ তিতিক্ষায়- সে মহামানব শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কোন কবি, কোন রাজনীতিবিদের তুলনা দেয়া ‘দেশদ্রোহীতা’র সমান।
লেখক:
এ বি এম ফয়েজ উল্যাহ
কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।


কাজ নেই তাই ফালতু গভেষণা। আপনি তাদের মত বড় মাপের সাহিত্যিক হতে পারেন নি তাই অহেতুক হিংসা করে তাদের মানহানি করবেন না।
ReplyDelete