আধুনিক কবিতার ছন্দ, পংক্তি-প্রকরণ ও অন্তমিল উৎস আল-কোরআন



-এ বি এম ফয়েজ উল্ল্যাহ:::

The miracle of the Holy Quran in the field of  rhyme and prosody ’নামে আমার লিখা একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলাম কুয়েতের Writers guild  এর অনুষ্ঠানে। এই অনুষ্ঠানে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইরান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, কুয়েত, সৌদী আরব, ইন্দোনেশিয়া সহ ১৫টি দেশের মহামান্য রাস্ট্রদূত, কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক ও গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। আমার ঐ প্রবন্ধে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম যে পৃথবীর সব দেশের সব ভাষার কবিরাই তাদের কবিতার ছন্দপ্রকরণ, পংতিমালা ও অন্ত্যানুপ্রাস বা অন্তমিল পাক কোরানের সুরাসমুহের ছন্দ, পংক্তি সংখ্যা ও অন্তমিলের অনুকরণ, অনুসরণে তৈরি করেছেন। অতীত ও আধুনিক কালের ছান্দসিক, গবেষক এবং কবিবৃন্দ নানান নামে, বিচিত্র ঢংগে যে সব কবিতা লিখেছেন বা লিখছেন তার মূল উপকরণ আল কোরআন থেকে সংগৃহীত।

    আল-কোরান জগত-প্রভু মহান সষ্ট্রা পরম করুনাময় আল্লাহর অমিয় বাণী। একাধারে সাহিত্য, মহাকাব্য, বিজ্ঞান, রাস্ট্রবিজ্ঞান, খগোল বিজ্ঞান, দর্শন শাস্ত্র, সমরশাস্র, ইতিহাস, এন সাইক্লোপিডিয়া অফ ল, অর্থশাস্ত্র ও পৌরবিজ্ঞান, ধর্মশাস্ত্র-তথা পৃথিবির সর্ব বিদ্যার, সর্ব জ্ঞানের একমাত্র মহাগ্রন্থ। এটি সৃস্টি শ্রেষ্ঠ  মানবের [খলিফাতুল্লাহ] সর্ব বিদ শাস্ত্র শিক্ষার ও কল্যাণের আধার একমাত্র মহাগ্রন্থ। জগত বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকেরা আজ মানতে বাধ্য হয়েছেন যে আল-কোরানের চেয়ে বড় বিজ্ঞান-গ্রন্থ আর নেই। আল-কোরান, বিজ্ঞানময় অলৌকিক মহাগ্রন্থ। মনুষ্য আবিষ্কৃত পৃথিবীর আজকের সমস্থ শাস্ত্রের মূল উতসস্থল আল-কোরান। বর্তমানের সকল দেশের,সকল ভাষার সকল সাহিত্যের উন্নতির মূলেও রয়েছে আল-কোরানেরই অবদান।পয়ার থেকে শুরু করে সনেট তক; যা দশম শতাব্দি থেকে একবিংশ শতাব্দির ১লা দশকে এসে চরম উতকর্ষতা লাভ করেছে, তার উৎসভূমিও আল-কোরান।
‘আল-কোরান’ মহান আল্লাহর বাণী। সুতরাং এতে ব্যবহৃত আরবী ভাষা রাব্বুল আলামিন আল্লাহরই পাক ভাষা। তাই এই ভাষা যে সর্বপ্রথম ভাষা, সূপ্রাচীন, আদি এবং অকৃত্তিম, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। সৃষ্টির প্রথম মানব হযরত আদম[আ;]কে যে ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছিল-তা আরবী।ইমাম আবু মনসুর মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-আজহারী লিখছেন,“মানুষের দুনিয়াতে আগমনের পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম[আ;]কে আরবী ভাষা শিক্ষা দানের মাধ্যমে এ’ভাষার সূচনা করেণ।।আরবী ভাষা যে সবচেয়ে প্রাচীন তার অকাট্য প্রমান হলো,পবিত্র কোরানের ভাষা আরবী। কোরান যেহেতু অনাদিগ্রন্থ, তাই এর ভাষাও অনাদি।

আধুনিক কালের ভাষাবিদ ও প্রত্নতাত্তিক গবেষকদের গবেষনায় এ’ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, প্রায় পাচ হাযার বছর পূর্বে মধ্য এশিয়ায় একটি সু-সভ্য জাতি বাস করতো। তারা হযরত আদম (আঃ) ভাষা তথা আরবী ভাষায় কথা বলতো। ‘আল-কোরানে হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ) মিলনের স্থান ‘মক্কা’কে নির্দিষ্ট করে বলা হযেছে,‘উম্মুল কুরা”। অর্থাৎ সকল দেশের উৎস, জননী এই মক্কা। পৃথিবীর আদী বসতি। এদের মাতৃভাষা ছিল ‘আরবী’, যা হযরত আদম’র (আঃ) ভাষা। এ ভাষাই ‘ইন্দোইউরোপিয়ান’,‘কেন্তম’ [Centum শতম [[Satam]]নামে পৃথিবীর নানান দেশে নানান ভাষা-শাখার জন্ম দেয়। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখেনা যে ‘কেন্তম’, ’শতম’র জন্মদাত্রী ভাষার মূল. আরবীভাষা। আর ‘শতম’র ‘ইন্দোইরানীয়ান’ ভাষার ধারাবাহিক ও বিবর্তিত, পরিবর্তিত, রূপ আজকের ইরান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশের প্রচলিত সব ভাষা।

সুতরাং কোরান হাদীসের আলোকে এই অভিমত অকাট্য প্রমাণ করে যে আরবী ভাষাই হলো সর্ব প্রথম ও সর্বপ্রাচীন। মহান আল্লাহ তায়ালা আরবী ভাষায় কোরান নাজিল করায় এই ভাষার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ত প্রমাণিত হয়েছে। এই ভাষায় বহিরাগত শব্দসমষ্ঠি প্রবেশ করতে না পারায় এর বিশুদ্ধতা প্রশ্নাতীত। জনৈক ফরাসী দার্শনিকের মতে, ’আল-কোরান ভাষাবিদদের জন্য একটি শব্দকোষ, কবিদের জন্য একটি কাব্যগ্রন্থ’। ‘অতুলনীয় সাহিত্যগুনে কোরান পরিপূর্ণ। কোরানের কাব্যময়তা, গৈদ্যশৈলী, উপমা, রূপক,উচ্চভাষার সাহিত্যমূল্য ও বর্ণনার অপরসীম সমৃদ্ধতা চিরসত্য। কোরান শুধুমাত্র দর্শন নয়, সাহিত্যও বটে। কোরানের ভাষার কাব্যধর্মিতা, ছন্দমহীমা ও অন্তমিল অতুলনীয়, অসৃজনীয়’ [-মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ]। প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তায়লা অনুপম ছন্দ-সৌকর্যে যে বিজ্ঞানময় মহাকাব্য মহাগ্রন্থ আল-কোরান তার প্রিয় হাবিব হযরত মোহাম্মদ[দঃ]-এর মাধ্যমে তার সৃস্ট মানবের প্রতি প্রেরণ করেছেন,তার তুলনা আর দ্ধিতীয়টি নেই।

 পৃথিবীতে ইসলাম ধর্মের আগমনের বা প্রবর্তনের পূর্বের যে আরব ও আরবীয়দের নিয়ে আজকের সভ্যজগত ব্যঙ্গ করে এবং সে যুগকে ‘অন্ধকার যুগ’ ও ‘বর্বর’ আখ্যায়িত করে থাকে; সেই আরবীরা তখন কাব্যে, সাহিত্যে এতোটাই উন্নতি করেছিলেন যে পৃথিবীর কোন দেশ ও জাতির জন্য তা ছিল কল্পনারও অতীত।আরবে তখন কবিতার স্বর্ণযুগ। ৬১০ খ্রিস্টাব্দ সময় কাল থেকে আল-কোরান নাজিল হতে থাকলে কোরানের ছন্দ,পংতি-প্রকরণ, শব্দচয়ন, অনুপ্রাস এবং অন্ত্যানুপ্রাস ইত্যাদি অবলোকন করে ততকালিন আরবের কবিকূল শ্রেষ্ঠ্ররাও বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলেন। “আরবি ভাষায় আল্লাহর নাজিলকৃত মহাগ্রন্থ আলকোরান যেমন মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান, তেমনি এর শব্দ-বিন্যাস, বাক্য-গঠন প্রণালী, তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়োগ-বিধি, ঊপমা, ছন্দ, বিশিষ্টাত্মক শব্দ, লালিত্যময়তা সবকিছু মিলিয়ে এ এক অপূর্ব গ্রন্থ। এ আসমানী গ্রন্থ আরবী সাহিত্যের অদৃষ্টপূর্ব মডেল। অর্দ্ধ-পৃথিবীর শাসক আরবেরা যে প্রান্তে বিজিয়লাভ করেছে, মহাগ্রন্থ আর-কোরান তাদের সঙ্গে গেছে। বিশ্বের এক বিস্তৃত ভূখন্ডে আরবী দৈনন্দিন ভাষায পরিণত হযেছে। অনারবেরা মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে আরবী ভাষাকেও গ্রহণ করে নিয়েছে। আবার সে সব দেশের অমুসলিমেবাও আরবী ভাষাকে আপন করে নিয়েছে। ফলে সেখানকার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনাচারে আল-কোরানের প্রভাব প্রভুতভাবে পডেছে। মুসলিম, নাসার, খৃস্টান, পৌত্তলিক-মুশরিক, তুর্কি, ফার্সিকেরা আল-কোরানের শব্দ, ভাব, কাহিনী, বিষয়, বর্ণনা, রূপক, উপমার আদলে তাদের নিজ নিজ ভাষাকে উন্নত করেছেন। কাব্য সৌন্দয্য বর্ধিত করেছেন।

ফলে, পৃথিবীর সব ভাষার আধুনিক কাব্য-কবিতায় অনুপ্রাস, অন্তানুপ্রাস, ছন্দ, পংক্তি-প্রকরণ পদপ্রকরণ এবং পয়ার [coplet or Distich ], ত্রিপদি [Triplet ], চতুষ্পদি [Quatrain], ], পঞ্চম, ষড়পদি বা ষটক [Sestette], ], সপ্তম, অষ্টপদি বা অষ্টক [octave চতুর্দশপদি sonnet সহ লিমেরিক, ক্লারিহিউ, হাইকু, তানাকা ইত্যাদি যত প্রকারের কবিতা আজ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন দেশে প্রচলিত আছে, সে সবের উদ্ভবের উৎস যে আল-কোরান তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ভাষা, কবিতা ও ছন্দের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে; আজ থেকে পনেরশত বছর পূর্বে আল-কোরান ছাড়া পৃথিবীর কোন ভাষায় উপরিউক্ত নামে বা ছন্দে বা ষ্টাইলে কোন কবিতা লিখা হয়নি।তার প্রধান কারণ, ৬০০ খৃস্টাব্দেও যখন আরবে কাব্য কবিতার স্বর্ণযুগ তখন পুরো বিশ্বে কবিতার ‘অন্ধকার’ যুগ।
   
  ছন্দ-শাস্ত্রির কাজ হচ্ছে অনুপম মহাকাব্যের রূপ নির্মানে তার ছন্দ-সংজ্ঞাসূত্র নির্ধারণ ও আবিষ্কার করা।মনে রাখা দরকার, একটা ভাষার কবিতা যখন সুগঠিত রস রূপ লাভ করে, তখনই তার গঠন-তত্ত আবিষ্কারের সময় আসে। অষ্টম শতাব্দিতে খলীল বিন-আহাম্মদ যে আরবী ‘ছন্দো-বিজ্ঞান’ আবিষ্কার করেছিলেন তার প্রধান কারণ,সে সময় আল-কোরানের মাধ্যমে আরবী কবিতা একটা পরিণত রূপ লাভ করেছিল।

রহমতাল্লী আলামিন রাছুলে করিম হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা [দ;]-এর উপর সর্ব প্রথম নাজিলকৃত প্রজ্ঞাময়-আল্লাহর বাণী এক অনন্য [দ্বিপদি বা দ্বিপংতি ব] পয়ার বা cople.

                ‘ইকরা বিসমে রাব্বিকাল্লাজি খালাক,
                   খালাকাল ইনসানা মিন আলাক’
           অনুবাদ;-‘পাঠ কর নিজ প্রভুর নামে, স্রষ্টা যে জন,
                  করেছেন যিনি ঘন সে শোনিতে মানব সৃজন’-( কাজী নজরুল)
   
   কোরাআন শরীফের সমিল পদ্যভংগী ও গদ্যভংগী অনুসরণ করে আরবী ভাষায় প্রথম ‘মকামাহ’ [Assemblies] লেখেন বদিয়ল জামান আল-হামসানী [৯৬৯-১০০৭ কাশিম আল-হারিরি [১০৫৪-১১২২ খ্রী;] প্রনয়ন করেন পঞ্চাশটি ‘মাকামাত’। ঊল্লেখ্য, আল্লার হাবিব রাসুলে করিম (দঃ) নিজে সত্যভাষী, সুন্দর কবিতা ভালোবাসতেন। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) ও হযরত উসমান (রাঃ) কবিতার সমজদার ও লেখক ছিলেন। হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন আরবী সাহিত্যের বড় পন্ডিত। তাঁর কবিতা সংকলন “দিভানে আলী” নামে খ্যাত। হযরত ফাতেমা (রাঃ) অনন্য মহীলা কবি ছিলেন। সাহাবাবিএ-কেরামদের মধ্যেও বহু খ্যাতিমান কবি ছিলেন।

‘মাকামাত’র মূল নিদর্শনের উপমায় নিন্মে আল-কোরান’র (৬১০-৬৩৩ খৃস্টাব্দ) তিনটি ক্ষুদ্রায়তন সূরা উদ্ধৃত করা গেল;-
                          সূরা কাওছার
                 ইন্না আ’তয়াইনা-কাল কাওছার।
                    ফাছাল্লিলি-রাব্বিকা ওয়ানহার।
                  ইন্না শা-নিয়াকা হুয়াল আবতার।
আরবী ‘সালসা’ বর্তমানের আধুনিক বিশ্ব সাহিত্যের ইংরেজি Triple, জাপানী Haiko, বাংলার ত্রিপদি বা ত্রিপংতির কববিতা ।মূল উৎপত্তি স্থল আল-কোরানের সূরা ‘কাওছার’।
    আর ‘সূরা ইখলাছ’ থেকে চতুষ্পদি (রুবাঈ) কবিতার যাত্রা;-
                                  ‘কূল হুলাল্লাহু আহাদ
                                       আল্লাহুস সামাদ
                             লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ
                          ওয়ালাম ইয়াকূল-লাহু,কুফুয়ান আহাদ’।

এর আদলেই ইরানি মহাকবি শেখ সাদী লেখেন,
                    
                                 ‘বালাগাল উলা বি-কামালিহি
                                কাশাফাত তুজা বি-জামালিহি
                                 হাসুনাত জামিও খিছালিহি
                                   সাল্লু আলাইহি ওয়ালিহি’।

         আধুনিক বাংলার চতুষ্পদি বা চৌপদি বা চৌপংক্তি, ইংরাজি Quatrainআর ফারসী রুবাই ইত্যাদির উৎসভূমিও আল-কোরানের সুরা এখলাছ। এই সুরাকে কেন্দ্র করেই ইরানের মহাকবি হাফিজ, শাদী, ওমর খৈয়ামেরা বিখ্যাত সব  রুবাই রচনা করেন। তবে ফারসীর রুবাঈ‘র যে ঢং(KKLK)তার প্রবক্তা কোন ফারসিয়ান কবি নন। এর প্রবক্তা হযরত আলি (রাঃ)। তাঁর লিখিত রুবাঈ [Rubai];-

‘এলাহি তুবতু মিন কুল্লিল মায়াছি
বে-এখলাছির রাজায়াল্লিল খালাছি,
আ-গেছনি এয়া গিয়াছাল মোস্তাগেছিনা
বে-ফাদলেকা এয়াওমা এয়াখাজু বিন নওয়াছি’।
   সমিল পাঁচ পঙতির কবিতার মূল ঊৎস সুরা ফিল।‘খামছা’ বা ‘মখচ্ছম’।             
             ‘আলামতায়রা কাইফাপায়লা রাব্বুকা বিয়াঝহা বিলফিল
                      আলামিয়াজ আল কায়দাহুম ফি তাতলিল
                      ওয়ারসালা আলাইহিম তয়াইরান আবাবিল
                        তারমিহিম বিহাজারাতিম মিন সিযযিল
                             ফাযালাহুম কাছমিম  মাআকুল’।     

 পাচ পংতির এই কবিতার অন্তমিল ‘বিলফিল,’ ‘তাতলিল,’ ‘আবাবিল’, ‘সিযজিল’,’মাআকুল’ বর্তমানের আধুনিক সাহিত্যে দুর্লভ।

আর অন্তমিলের ছয় পংতি কবিতার (ষষ্টক বা ‘মছদ্দস’) মূল উৎস সুরা নাস;-
                           ‘কূল আওজু বিরাব্বিন নাস               
                                  মালিকিন নাস
                                    ইলা-হিন্নাস
                    মিন শাররিল ওয়াস ওয়াসিল খান্নাস
                  আল্লাজি ইয়ো-ওয়াসবিসো ফি ছুদরিন্নাস
                         মিনাল জিন্নাতি    ওয়ান্নাস’।

   ছয় পংতির এই আরবী কবিতার অন্তমিলে ‘বিন্নাস’, ’কিন্নাস’, ’হিন্নাস’, ’খান্নাস’, ’রিন্নাস’, ’ওয়ান্নাস’, শব্দ যঙ্কারের যে যাদু সৃষ্টি করেছে, বিশ্ব সাহিত্যে তা দুর্লভ।

আজকাল ইংরেজী, বাংলা ও অন্যান্য ভাষায় যে কককক খখ গগ ছন্দের আট পংতির অন্তমিলের কবিতা দৃষ্ট হয় তা আল-কোরানের সুরা ‘আলামনাশরাহ-এর যে অনুকরণ তার পরিচয় নিন্মে দেওয়া গেল;-
                 ‘আলামনাশ রাহালাকা ছাদরাকা
               ওয়াওয়াদ্দা ওয়ানা আনকা ওয়াজরেকা
                    আল্লাহজী আনক্কাদা যাহরাকা
                   ওরাআ কায়না-লাকা যাহরাকা ।
                   ফাইন্না মায়াল উছরে ইউছরান
                     ইন্নামায়াল উছরে ইউছরান।
                     ফায়েজা ফারাগতা ফানছাব
                    ওয়াইলা রাব্বেকা  ফারগাব।‘

সুতরাং সংশয়হীন ভাবে বলা যায় যে, আধুনিক বিশ্ব-সাহিত্যে লাইন-ভিত্তিক, অন্তমিল-ভিত্তিক ছান্দসিক কবিতা যথা;-দ্ধি-পদী, ত্রি-পদী, হাইকু, চতুষ্পদী, ক্লারিহিউ, পঞ্চ-পদী, লিমেরিক, তানাকা সনেট, ছয়-আট-নয়-দশ-বারো পদী কবিতা এবং ভাব-প্রধান, শব্দ-প্রধান গদ্য কবিতা, চতুর্দশপদী কবিতা, বর্ণনামূলক, প্রেম-উপাখ্যান মুলক এবং অভিসম্পাদ মূলক কবিতার উৎস-মূল একমাত্রই আলকোরান।

নামজাদা কবি-সাহত্যিকদের নামীদামী কাব্য,সাহিত্যকে অনুকরণ অনুসরণ করার রেওয়াজ প্রচলিত আছে বর্তমান বিশ্বে। আর অনন্ত প্রেমের আধার, অনন্ত সুন্দর, অভিজ্ঞ কুশলি শিল্পী, ভাস্কর, মহাজ্ঞানী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহর বিজ্ঞানময় মহাগ্রন্থ-মহাকাব্য আল-কোরান যে জগতের সব কবি, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিকের অনুকরণীয় হবে, তাতে আশ্চার্যের কি আছে?

আরবী ‘কসিদা’ আধুনিক বিশ্বের গীতিকবিতা। ফার্সি, উর্দ্দু, বাংলা, হিন্দির গজল আরবী ‘নসীব’। এটি ‘গীতি কবিতা’ও। শোকগাথা ‘মরসিয়হ’। গৌরবগাথা ‘আল-ফখর’। প্রশংসাগীতি ‘মদহ’। প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনামূলক কবিতা ‘ওসফ’। খন্ড কবিতা ‘কিতআ’। আল্লাহর প্রশংসামূলক কবিতা ‘হামদ’। আর রাসুল (দঃ) প্রশংসাগীতি ‘নাত’। কবি কয়স্ এবনে-মুলওভাহ্ (মজনু) অষ্টম শতাব্দির বিখ্যাত ‘কসিদা’ রচয়িতা ছিলেন। তিনি ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যের নায়ক। 
                             
‘ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফরাসীর কয়েকজন কবির প্রচেষ্টায় গদ্য কবিতা জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম হইতেই ইংরেজী সাহিত্যের খ্যাতনামা কয়েকজন কবি Walt Whitman-এর অনুকরণে গদ্য ছন্দকেই ভাব বহনের একমাত্র উপযোগী ছন্দ বলিয়া মানিয়া লইয়াছিলেন।----নতুনত্তের প্রতি মোহও নতূন ছন্দের প্রবর্তনের কারণ বলিয়া গণ্য হতে পারে।

শক্তিমান লেখক না হইলে এই ছন্দে কবির অপমৃত্যু, তাহাতে আবার শক্তিহীন কবিযশ প্রার্থীর অদম্য আগ্রহেই তখন এই ছন্দ লইয়া বাংলায় খুবই পরীক্ষা নিরীক্ষা চলিতেছিল।বাংলার আসরে নূতন কবিগণও ইহাকেই যখন সুবিখ্যাত করিতে লাগিলেন, রবীন্দ্রনাথও তাহাদের দলে নাম সহি করিলেন’ [-গদ্য কবিতা;-শীচন্দ্র দাশ ]

 অথচ ১৫শত বছর পূর্বে আল-কোরানে সেই অতুলনীয় ‘গদ্য কবিতা’ লিপিবদ্ধ হয়েছে। ছন্দ-বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন, ’সমিল গদ্য ভংগী কবিতা’। আরবীতে ‘আল-সাজআ’ [Al Saja  / Sadj]।ইংরেজী সাহিত্যে Dramatic Blank Verse  ও Epical Blank Verse. এই ধরণের কবিতার গতিলীলাকে নিয়ন্ত্রন করে ধনি-ছন্দের পরিবর্তে ভাবছন্দ thought rhythm

প্রকাশভংগী গদ্যের হলেও এই সব কবিতায় সুরের রেশ অনন্য। ১৫শ’বছর পূর্বে অবতীর্ণ আল-কোরান’র অসংখ্য সূরাকে ড.তাহা হুসয়েন ও ঐতিহাসিক এবনে খালদুন বলেছেন,“কুরআন আরবী গদ্যের আদি গ্রন্থ”।‘সওজ’কে বলা হয়েছে, ‘প্রবাহমান ছন্দবদ্ধ গদ্য’। বাংলাসাহিত্যে এ’নিয়ম মেনে যারা গদ্য কবিতা লিখছেন,তারা সফল। আল-কোরআন থেকে ‘গদ্য কবিতা’র মাত্র দু’টি উদাহরণ দেয়া গেল;-                                         
                 ‘ইজাজাআ নাছরুল্লাহি ওয়াল ফাতহু                   
                  আরাইতান্নাসা  ইয়াদখুলুনা ফি দি নিল্লাহি আপওয়াজা                                         
                  ফাছাব্বে বিহামদে রাব্বুকা ওয়াস্তাকফিরহু
                  ইন্নাহু কাআনা তাওয়াবা’।  এবং
                  ‘লি-লাফে কোরাইসীন,ই-লাফে হীম
                   রেহিলাতাস সীতাহে ওয়াচওয়াইফ
                   ফাল ইয়াবুদু রাব্বাহাজাল বাইতাল্লাজি
                   আতওয়া মাহুম মীন-জুইয়ও
                   ওয়ামানাহুম মিন খাওফ’।   

 অর্থাৎ প্রতীচ্যের ফ্রী-ভার্সের অনুকরণ হিসেবে বাংলায় তথা প্রাচ্যে যা আজ আধুনিক গদ্য-কবিতা নামে খ্যাত,তা আল-কোরানে ১৫শত বছর পুর্বেই লিপিবদ্ধ রয়েছে।এটি কোন নতুন আবিষ্কার নয়।

বর্তমান বিশবে আধুনিক কবিতায় বা কাব্যগ্রন্থে যে জাহান্নাম-জান্নাতের বর্ণনা ও অভিসম্পাত মূলক কবিতার ধারা বিরাজমান, তারও উদ্ভব গ্রন্থ আল-কোরান। ‘সূরা লাহাব’-এ আল্লাহ তাআলা ইসলাম ও রাছুল[দ;] বিদ্ধেষী আবু লাহাবকে অভিসম্পাত করেছেন।
‘তাব্বাত ইয়াদা আবিলাহাবিও ওতাব্
মায়াগ্না আনুহু মায়ালুহু ওমা কাছাব’
 অর্থাৎ ‘ধংশ হয়ে যাক আবু লাহাবের হস্তদ্ধয় ও স্বয়ংগ আবু লাহাব’।এ’সুরা থেকে জন্ম নিয়েছে অভিশম্পাত মুলক কবিতা। ইংরেজি সাহিত্যে ‘সুইনবার্ন’র
                    ‘সর্পদষ্ট মৃতসম মরিয়াও হইবি অমর-
                    শব হয়ে জাগিবিরে মৃত্যুহীন মরণ-বাসর’  এবং বাংলা সাহিত্যে ‘মুহিতলাল মজুমদার’-এর ‘দ্রোণ-গুরু’ কবিতায় নজরুল ইসলামের প্রতি অভিশম্পাত ;-
                  ‘অভিশাপরুপী নিয়তি করিবে নিদারুন পরিহাস
                   চরমক্ষণে মেদিনী করিবে রথের চাকা গ্রাস!
 এবং শেকস্পিয়ারের ‘কিংগ লিয়ার’-এ রাজার অভিসম্পাত এ প্রসংগে স্মরণযোগ্য।আবার আল-কোরানের অবিষ্মরণীয় প্রেম-উপাখ্যান ‘ইউছুপ-জোলেখা’কে নিয়ে ফার্সী, উর্দু, ইংরাজী, বাংলায় ছন্দিত-নন্দিত কাব্য রচিত হওয়ায়, এটি যে মহাকাব্যেরও জননী-তা প্রমাণিত।
     
আল-কোরানের সূরা বা কবিতা সমুহের ছন্দ যেমনি মৃন্ময় তেমনি তড়িত চঞ্চল। প্রত্যেকটি ছন্দের আলাদা আলাদা গতি। অনেক ছন্দে তাল এক, মাত্রা আর অনুমাত্রার বিচিত্র সমাবেশে আশ্চার্য্য রকমের ধ্বনি ও গতি চপলতা ফুটে উঠেছে। বাংলাসাহিত্যে মোহিত লাল মজুমদার, সত্যেন্দ্র নাথ দত্ত, গিরিশ চন্দ্র, কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, বেনজীর আহমদ সার্থক ভাবে কোরানিক-ছন্দ ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন।

কবি মাত্রই জানেন, ’কবিতার কথা হচ্ছে শব্দব্রম্ম’ [-ক্রিস্টফার কডওয়েল]। সাথে সাথে ক্লড রয় বলেন, ‘কবিতা হচ্ছে কথা দিয়ে গড়া একটি সুক্ষযন্ত্র; এর উপাদান হয়েছে মানুষের সত্তাকে কাঁপিয়ে তুলবার জন্য’। কাব্যময় আল-কোরানের প্রতিটি শব্দই এক একটি শব্দব্রম্ম। প্রতিটি শব্দই মানুষের অন্তকরণকে কাপিয়ে তুলে অন্তর হতে অন্তরে স্রস্টার অপার করুনা, মহীমার দ্যুতি ছড়িয়ে দেয়। আল-কোরানে আল্লাহ পাকের চয়নকৃত, ব্যবহারিত ‘শব্দ’রাজির তুলন এর প্রতিশব্দ নির্মান আজ পর্যন্ত কোন দেশের, কোন ভাষার কবি সাহিত্যিক, ভাষাবিদ, ছান্দসিক, অলংকারিকের পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং ভবিষ্যতেও সম্ভব হবেনা। এই চ্যালেঞ্জ আল্লাহ নিজের। সুতরাং অবিনাশি কাব্য কবিতার জন্য সুনির্বাচিত শব্দের প্রয়োজনিতা যে অপরিহার্য তা প্রতিভাবান কবি মাত্রই আজ ওয়াকেফহাল,আল-কোরানের বদৌলতে’।

ক্লড রয় বলেন,‘সাহিত্যের মধ্যে কারুকাজ, কাব্যে যার প্রাধ্যান্য তার একটি দিক হচ্ছে শব্দের সাজাই বাছাই করা’ তিনি আরো বলেছেন,‘শব্দ বাছাই, ভাব বাছাইয়ের শিল্পকাজ চলছে পৃথিবীর সাহিত্য জুড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ছন্দে চলেছে ধ্বনির কাজ। সেটা গদ্যে চলেছে অলক্ষে, পদ্যে চলেছে প্রত্যক্ষে’। [বাংলা ভাষা পরিচয়] ফরাসী কবি ‘পল এলুয়ার’ শব্দ বাচাই সম্বন্ধে বলেছেন, ‘কবিতাকে আরো বলতে পারো রেডিয়াম ধাতুর নিষ্কাসন
বহু বছরের মেহনতে কয়েক রতি-মাত্র নিকষিত।
একটা মাত্র শব্দের প্রয়োজনের খাতিরে
হাজার হাজার টন শব্দের ধাতব-চাং
ভাংতে হয় আমাকে,
ছেকে বার করে আনতে হয় সেই প্রয়োজনীয় শব্দ’।
আর আল-কোরানের প্রতিটি শব্দই বিকল্পহীন,তুলনাহীন শব্দব্রম্ম।

বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নিদর্শন ‘চরযাপদ’ ,পন্ডিতদের মতে ৬৫০-১১৫০ সালের মধ্যে লিখিত।এর ভাষা নিয়ে মবভেদ আছে।কথায়,শব্দে বাংলা,অহমি ও উড়িয়া ভাষার মিল পরিরক্ষিত হয়।তবুও পন্ডিতেরা একে বাংলাভাষার আদিরূপ তথা সূচনাযুগের ‘আলো-আঁধারি’ ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ৬৫০-১৩৫০ সন তক কালকে বাংলাভাষার প্রাচীনযুগ ধরা হয়। এ’সময়কালে বাংলাভাষার আর কোন নিদর্শন পাওয়া যায়নি।।কারণ সেনদের রাজত্বকালে সংস্কৃত ছাড়া সব ভাষা ছিল নিষিদ্ধ।মুসলমান শাসকদের আগমনে তাঁদের হাত্ ধরে বাঙলাভাষা নবজন্ম লাভ করে।তাদের হাতে বাংলাভাষা লালিত পালিত ও পৃষ্ঠপোসকতা লাভ করে সাহিত্যে,কাব্রে উন্নতির শিখরে পোঁচেছে।

তবে বংগে মুসললিম শাসকদের আগমন ১২০৪ খৃস্টাব্দ হলেও সপ্তম সতাব্দি(৬৫০)থেকে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে সাহাবায়ে-কেরাম ও ধর্মপ্রচারকবৃন্দ এ’এলাকায় এসে ধর্মপ্রচার শুরু করেন। নওসুসলিমেরা আল-কোরানের সংস্পর্শে আসেন। আল-কোরানের শব্দ, ছন্দ, ভাবসম্পদের সাথে পরিচিত হন।সুলতানদের আমলে ফার্সী রাজভাষা হওয়ায় মুসলিম অমুসরিম নির্বিশেষে ফার্সিভাষা শিক্ষা লাভ করেন। বিশেষ বরেি অমুসলিমেরা সরকারি উচ্চপদে আসিন হন। মুরু হয় ফার্সি সাহিক্য চর্চা। ধর্মাধর্ম নির্বিমেষে কবিগন কোরান থেকে ফার্সিতে অনুদিত,সংগৃহীত বহুবিদ ছন্দ, রুপক, গাথা, ভাবসম্পদ বাংলাভাষার নিজ অঙ্গে ধারণ করায়ে বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে।

উল্লেখ, চরযাপদ রচনার পরবর্তিকালে একমাত্র মুসলমান ও আরবি,ফার্সি ছাড়া অন্য কোন জাতি বা ভাষার সংস্পর্শে আসেনি।

 প্রাচীন বাংলাকাব্যে অক্ষরসংখ্যা ও যতির কোন নিয়ম ছিলোনা।শুধু চরণের শেষে ব্যঞ্জনের মিল ছিলো। ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেন এ প্রসংগে লিখেন,“ আমরা বাংলা পদ্যের প্রাচীন যে নিদর্শন পেয়েছি, তাতে কোন ছন্দ বা প্রণালী দৃষ্ট হয়না।ৃযতি বা মিলের কিছুমাত্র নিয়ম দৃষ্ট হয়না।ভাবপ্রকাশের প্রয়োজনে অক্ষর সংখ্যা ২৪, ২৫, ২৬ ও অতিক্রম করেছে আবার স্থল বিশেসে ১২, ১০ এ অবতরণ করিয়াছে”।

বাংলাভাষায় আরবি ছন্দের (বহুলাংশে ফার্সির হাত ধরে তথা পরিমার্জিত, পরিবরিধত রূপে) বাংলায় প্রবেশ করার প্রধান কারণ, ‘সংস্কৃতে পয়ার নাঈ, রঘু-ত্রিপদিও নাঈ’। অথচ বাংলার প্রাচীন ও প্রধান ছন্দ পয়ার। পয়ারের নানাভাগ ত্রিপদী, লঘু ত্রিপদী ও লাচারী। চন্ডিদাস, মালাধর বসু, শ্রীকর নন্দি, কবীন্দ্র পরমেশ্বর, সৈয়দ সুলতান, দৌলত উজির বাহরাম খান, মুহাম্মদ সগীর, আলাওল, ভারতচন্দ্র, মহাকবি নবীনচন্দ্র সহ রবীন্দ্র, নজরুল থেকে আজকের আধুনিক কবিরাও এ সব ছন্দে লিখছেন, লিখবেন।

সংস্কৃতেপয়ারছন্দ (ত্রিপদী, লঘুত্রিপদী, লাচারী )না থাকায় ‘রামায়ন’, ‘মহাভারত’, ’বেদ’, ‘গীতা’, ’উপনিষদ’, ’মেঘদূত’, শুকুন্তলা, ‘শ্রীকৃষ্ণ কীরতন’, মনশা মঙ্গল’সহ ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ এবং মহাকাব্য সমুহের অনুবাদে বাংলা দ্বিপদী, ত্রিপদী, লঘু-ত্রিপদী ও লাচারী ছন্দ ব্যবহৃত হযেছে। যা মূলতঃ আরবী ছন্দ। অর্থাৎ মুসলিম যুগের পর থেকে বাঙলায় যে সব ছন্দ ব্যবহার হচ্ছে, তৎপুর্বকালে তার হদিস মিলেনা। বাংলা ভাষাভাষি কবি সাহিত্যিকবৃন্দ তাদের সাহিত্যকর্মে এর বাংলা সাহিত্য তার আঞ্চলিকতা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক ভাবসম্পদ ও ঐশ্বয্যে সমৃদ্ধ হযে উঠেছে।

মনে রাখা দরকার, পূর্বে যা ছিল তার সমিল বর্তমানের রচনা, কর্ম ইত্যাদি যেমন উদ্ভাবিত কিছু, তেমনি নব-আবিষ্কারও নয়। আধুনিকতার রং ছড়িয়ে, পরিমার্জন, পরিবর্ধন করে নতুন ঢংগে প্রচার মাত্র। যেমন, মাত্র দু’শ বছর পূর্বে বৈজ্ঞানিকেরা মাতৃগর্ভে মানুষের ক্রম-বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার সন্ধান লাভ ও সৃস্ট মহাজগতের গ্রহ, নক্ষত্র সমুহের নিজ নিজ কক্ষকথে পরিক্রমন সম্বন্ধে সন্ধান লাভ করেছে, তা আল কোরানে পনেরশ’বছর পূর্বেই স্পস্ট ভাষায় উল্লেখিত রয়েছে। তেমনি প্রাচীন ও বর্তমানের আধুনিক কবিতার উৎসভূমিও আল-কোরান। পংত্তি-গোনা পদ্ধতি, অনুপ্রাস-অন্তানুপ্রাস,শব্দব্রম্মের প্রয়োগ, গদ্য-ছন্দের অপুর্বমাধুর্যতা, গীতিপ্রবণতা, সোন্দর্য-প্রেম-বিরহ-অভিসম্পাদ-নরক-জাহান্নাম ইত্যাদির শৈল্পিক বর্ণনা যা আজ কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে, করছে তা আল-কোরানেরই অবদান; আল-কোরান থেকেই নেয়া। কারো কোন নতুন আবিষ্কার নয়। পুরাতন সূত্রাবলম্বনে নবতর আংগিক প্রাদান মাত্র।

      একদা জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কাব্যে-গাথায় যে মুসলিম জাতি জগতে অগ্রগন্য-বরেণ্য হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলো, যাদের পুস্তক অনুবাদ করে, পদাংক অনুসরণ করে ইউরোপে রেনেসা এসেছিল; সেই মুসলমানেরা আজ অন্য সবকিছুর মতো কবিতার ভাষা,ছন্দ খোজার জন্যও ইউরোপের তথা প্রতীচ্যের স্মরণাপন্ন হচ্ছে। এ বড় লজ্জার। আজ মুসলমান কবি সাহিত্যিকদের উচিত আল-কোরানের উৎসভূমিকে কেন্দ্র করে যে সকল ভাষার কবিতার সূত্র, ছন্দ আবিষ্কৃত হযেছে, প্রয়োজনে পরিমার্জন, পরিবর্ধণ করা হযেছে, তা প্রচার করা। বিশ্ব-সাহিত্যের উন্নতির মূলে রযেছে আল-কোরান’র অবদান।


তথ্যসূত্র:-
(১)বাংলা ভাষায় মুসলমানদের অবদান-শেখ তফাজ্জল হোসেন সম্পাদিত
(২)আরবী সাহিত্যের *তিহাস-আ.ত.ম মুসলেহ উদ্দীন।
(৩) হিষ্ট্রি অফ দা আরবস-পি, কে হিট্টি।
(৪) আসরারুল বলাঘহ-আবদুল কাদির জুরজানী।
(৫)কাব্যে আমপারা-নজরুল *সলাম।
(৬) রহমতুললিল আলামিন-কাজী মুহম্মদ সলমন।
(৭) আরবী ভাষা সাহিত্যের * তিহাস-জুরজী যয়দান।
(৮) তারিখে আরদুল কোরান-সৈয়দ সোলায়মান নদভী।


লেখক: এবিএম ফয়েজ উল্যাহ
গবেষক ও কলামিস্ট
               









No comments

Theme images by enot-poloskun. Powered by Blogger.