বিটকয়েন: এটা কী কাগজের মুদ্রার ভবিষ্যৎ উত্তরসূরী?


২০১২ সালের শেষের দিকের কথা। বিশ্বজুড়ে একযোগে ঘটে যায় এক সাইবার হামলা। র‌্যানসম ওয়ার নামের একটি কম্পিউটার হ্যাকিং প্রোগ্রাম বিশ্বের নামিদামী বিভিন্ন সংস্থার কম্পিউটার প্রোগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়াসহ ১৫০টি দেশ আক্রান্ত হয় এই হ্যাকিং প্রোগ্রামে। সারা পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি আক্রান্ত কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে উঠে মুক্তিপন বার্তা। কিন্তু মুক্তিপন হিসেবে কোনো প্রচলিত মূদ্রা নয়, দাবি করা হয় এক অদ্ভুত কারেন্সি! নাম বিটকয়েন। বলা হয় তিনশ কয়েন সমপরিমাণ বিটকয়েন দিলে রক্ষা পাবে এই সাইবার হামলা থেকে মুক্তি। আর এই ঘটনার পর থেকে উচ্চারিত হতে থাকে বিশ্বের নানান প্রান্তরে।

পৃথিবীজুড়ে প্রচলিত অর্থ ব্যবস্থায় কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে, আর আমরাও সেটা টের পাচ্ছি। পশ্চিমা দেশগুলো এই ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে যতটা ভাবছে ততটা আমাদের দেশের সরকার না ভাবলেও এর প্রতি আকর্শিত হচ্ছে আমাদের দেশের তরুণ সমাজ। কেউ বলছে এটা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অর্থ, আবার কেউ বলছে এটাতে কোন গাবলা আছে।

বিটকয়েন আসলে কি, কারা এর উদ্ভাবক, কোথায় করা হয়েছে, কিভাবে ব্যবহার করা হয় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এই প্রবন্ধে। তবে, চলুন তার আগে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে আসি মুদ্রার ইতিহাস।

মুদ্রার ইতিহাস: টাকা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমদিত এক বিনিময় মাধ্যম। এই টাকা ছাড়া জীবন প্রায় অচল। ডলার, ইউরো, ডিনার, রুপি, একেক দেশে একেক ধরনের মুদ্রা। সহজ কথায় টাকা বা মুদ্রা-ই হলো পৃথিবীর প্রধান বিনিময় মাধ্যম। কিন্তু একটা সময় যখন পৃথিবীতে কোনো টাকার অস্তিত্ব ছিল না। তখন চলত পণ্য বিনিময় প্রথা। একটা সময় সেই পণ্য বিনিময় প্রথাতেও জটিলতা দেখা দেয়। আর তখনই বিকল্প হিসেবে চলে আসে কড়ি, মাছের দাঁত কিংবা পালকের মুদ্রা ব্যবস্থা। বলা হয়, বিনিময়ের সেই মাধ্যমই ছিল টাকার পূর্বপুরুষ।

ভারতবর্ষে টাকার যে লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় তা ২ হাজার ৪০০ বছর আগের। সম্রাাট চন্দ্রগুপ্তের শাসন আমলে ধাতু গলিয়ে বানানো পাতলা পাতের মান নির্ধারণ করে মুদ্রার প্রচলন হয়।

বাংলায় আলাদা ভাবে ধাতব মুদ্রা চালু করেন রাজা গিয়াস উদ্দিন হিলজি। পরে শত শত বছরের পরিবর্তনের হাত ধরে দেশে দেশে চালু হয় কাগজের মুদ্রা। এই টাকা ধরা যায়, ছোঁয়াও যায়। কিন্তু বিশ শতকে এসে এই টাকারও প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িয়ে গেছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বিটকয়েন নিয়ে যমুনা টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বর্তমানে যেদিকে যাচ্ছে পৃথিবী, এতে অনেকের কাছে টাকার ব্যবহারও অতিরিক্ত মনে হচ্ছে। এবং আগামী পৃথিবীতে টাকার পরিবর্তে এই বিটকয়েন-ই ব্যবহার করবে মানুষ।’

বিটকয়েন কি: বিটকয়েন হলো এক ধরনের অনলাইন মুদ্রা বা ডিজিটাল কারেন্সি। একে ধরা যায় না, ছোঁয়াও যায় না। এটা লেনদেনের জন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। বিটকয়েনের সর্বনিম্ন এককের নাম সাতোশী। এক কোটি সাতোশীতে হয় এক বিটকয়েন। লেনদেন হয় গ্রাহক থেকে গ্রাহকের ডিভাইসে। এটি তৈরি হয় অনলাইন মাইনিং পদ্ধতিতে। বর্তমানে একটি বিটকয়েনের মূল্য প্রায় ১৩,৩৮৩.৯০ ডলার। যদিও এই মূল্য বিভিন্ন সময় উঠানামা করে। বিটকয়েন কে আবার ক্রিপ্টোকারেন্সিও বলা হয়।

জানা যায়, সাতোশী নাকামতো নামের অজ্ঞাত ব্যক্তি এটি ২০০৮ সালে উদ্ভাবন করেন। তবে ২০১৬ সাালে মে মাসে অস্টেলীয় প্রকৌশলী এবং ব্যবসায়ী ক্রেক রাইট বিবিসির কাছে দাবি করেন, তিনিই সাতোশী নাকামতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, ‘মাইনিং পদ্ধতিতে বিটকয়েন তৈরি করে। এটা তারা খুব ইন্টারেস্টিং ভাবে তৈরি করে। তারা গণিতের কিছু সমস্যা সমাধান করতে চায়। এটা করে অনেকজন মিলে ক্যালকুলেট করার মাধ্যমে। এক হাজার জন এক সাথে ক্যালকুলেট করার চেষ্টা করছে, কিন্তু একজনই মাত্র জয়ী হচ্ছে এবং তাঁর কাছেই মূলত অর্থটা যাচ্ছে। অর্থাৎ সবার ব্যয় হবে, শুধু মাত্র একজনেরই লাভ হবে।’

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও মাইক্রোসফটের মালিক বিলগেটস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বিটকয়েন প্রচলিত মুদ্রার চেয়েও বেশি কিছু। এখানে অনেক অর্থ খুব অল্প জায়গায় রাখা যায় এবং বৃহৎ লেনদেন খুব সহজেই করা যায়। এটা হতে পারে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অর্থ। 

বিটকয়েনের বিনিময় পদ্ধতি: উপরের একটি আলোচনায় আগেই বলা হয়েছে বিটকয়েন লেনদেন হয় গ্রাহক থেকে গ্রাহকের ডিভাইসে। অর্থাৎ, কম্পিউটারের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই নেটওয়ার্কের মূখ্য বিষয় হচ্ছে ডাটা শেয়ার করা।

ব্লকচেইন নামক বিশাল ডাটাবেজ বিটকয়েনের সমস্ত বিনিময়ের হিসাব রাখে। এখন পর্যন্ত এই ব্লকচেইনে প্রায় ১৫ হাজার মেগাবাইট জমা হয়েছে। তাহলে ব্লকচেইনের হিসাব রাখে কে? যেহেতু বিটকয়েনের কোনো নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বিটকয়েনের একাউণ্টকে বলা হয় ওয়ালেট। এর মধ্যে বিনিময়ের হিসাব রাখার কাজটি স্বপ্রণোদিত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষই করে থাকেন।
বিটকয়েনের ওয়ালেটের ক্ষেত্রে দুটি চাবি ব্যবহার করা হয়। একটি হচ্ছে প্রাইভেট চাবি, আরেকটি হচ্ছে পাবলিক চাবি। এই চাবি দুটোর ধারাই বিটকয়েনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়।

বিটকয়েন যেভাবে তৈরি করে: উপরের বিটকয়েন কী আলোচনায় বিটকয়েন তৈরির পদ্ধতি বলেছিলাম। বলা হয়েছে বিটকয়েন তৈরি করে কম্পিউটার মাইনিং এর মাধ্যমে। যারা এই কাজটি করে তাদেরকে মাইনার বলা হয়। একটি ব্লকচেইনে নতুন একটি ব্লক যুক্ত করার জন্য একজন মাইনার পুরষ্কার হিসেবে পান ১২.৫ টি বিটকয়েন।

বিটকয়েনের জনপ্রিয়তার কারণ: ২০০৮ সালে বিটকয়েনের আবিষ্কার হলেও মূলত বিশ্বব্যাপী এর পরিচিতি লাভ করে ২০১২ সালের সেই সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে আপনি জেনেছেন, একটি বিটকয়েনের মর্তমান বাজার মূল। আপনি যদি সেই সময় বিটকয়েনে মাত্র ১০০ ডলার বিনিয়োগ করতেন, তাহলে বর্তমানে সেই ডলারের মূল্য হতো প্রায় চার মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

 বিশ্বব্যাপী বিটকয়েনের জনপ্রিয়তা কয়েকটি কারণ হচ্ছে:

এক. বিকেন্দ্রভূত: বিটকয়েনের নেটওয়ার্ক কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। কেউ চাইলে বিটকয়েনে জালিয়াতি করতে পারবে না। দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম।

দুই. সহজে একাউন্ট খোলা: একটি ব্যাংকে একাউন্ট খুলতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাগে কিংবা সময় খরচ হয়। কিন্তু বিটকয়েনে তার প্রয়োজন নেই। খুব সহজে বিটকয়েনের একাউন্ট গ্রাহক নিজেই সেটআপন করে নিতে পারে। কারও যদি কম্পিউটার ও ইন্টারনেট চালানোর অভিজ্ঞতা থাকে সেই বিটকয়েনে সহজে একাউন্ট সেটআপ করতে পারবে।

তিন. গোপনীয়তা: বিটকয়েনে একাউন্ট করা খুব সুরক্ষিত। এখানে কোনো গ্রাহকের পরিচয় কেউ জানতে পারে না। বিটকয়েনই এমন গোপনীয়তা মুদ্রা ব্যবস্থা।

চার. স্বচ্ছতা: এখানে চাইলে সহজে কেউ জালিয়াতি করতে পারবে না। সমস্ত লেনদেনের বিস্তারিত বিতরণ ব্লকচেইনে সংরক্ষিত থাকে। বিটকয়েন সিস্টেম চাইলেই একজন ব্যবহারকারী তার লেনদেনের গতিবিধি দেখতে পারেন।

পাঁচ. কম খরচে লেনদেন: আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময়ের জন্য একধরণের ট্র্যান্সফার ফি প্রদান করতে হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর জন্য চড়া ফি দিতে হয়। কিন্তু বিটকয়েন এর ক্ষেত্রে অনেক কম খরচে লেনদেন করা যায়।

ছয়. দ্রুততা: বিটকয়েনের অর্থ ট্রান্সফার খুব দ্রুত কাজ করে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

বিটকয়েনের প্রসারতা: ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান মতে প্রায় ২ লাখের বেশি ব্যবসায়ী এবং বিক্রেতা বিটকয়েনকে পেমেন্টের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। বিটকয়েন নিয়ে ২০১৭ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করা জানতে পারে প্রায় ২,৯ মিলিয়ন থেকে ৫.৮ মিলিয়ন মানুষ ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে অধিকাংশ ব্যাবহারকারী বিটকয়েন ব্যবহার করেছে।

বিটকয়েনের দুষ্প্রাপ্যতা: বিশ্বব্যাপী দিনদিন বিটকয়েনের জনপ্রিয়তা কতটা বাড়ছে সেটা বুঝা যায় দুষ্প্রাপ্যতা দেখলে। প্রথম দিকে একটি ব্লক ব্লকচেইনে যুক্ত করা হলে ৫০টি বিটকয়েন দিত। ২০১৫ সালের দিকে বিটকয়েনে লেনদেনের হার বাড়ায় প্রতিটি ব্লক ব্লকচেইনে যুক্ত করলে দেয়া হতো ২৫টি বিটকয়েন। বর্তমানে দেয়া হয় মাত্র ১২.৫ টি বিটকয়েন।

No comments

Theme images by enot-poloskun. Powered by Blogger.